সর্বশেষঃ

“নকলের দাবী কে করেছে?” চরফ্যাশন কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ভোলার চরফ্যাশন সরকারি কলেজের চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো একটি অপপ্রচার নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মূল প্রশ্ন— “পরীক্ষার হলে আমরা নকল করতে চেয়েছি, এমন মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবী আসলে কে বা কারা করেছে?

​শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাদের এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে ভিন্নখাতে মোড় নিতে এবং সাধারণ মানুষের চোখে অপরাধী বানাতে ‘নকল করতে না পেরে আন্দোলন’—এমন একটি বানোয়াট তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যার সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। প্রকৃতপক্ষে, তারা কোনো ধরনের অসদুপায় বা নকলের পক্ষে নন; বরং পরীক্ষার হলে পরিদর্শকদের অতিরিক্ত কঠোরতা, অমানবিক আচরণ, ব্যক্তিগত বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্য এবং অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ সৃষ্টির প্রতিবাদেই তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছেন।

​নিজেদের দাবির পক্ষে শতভাগ অনড় থেকে শিক্ষার্থীরা এক বড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন।

তারা বলেন,​”পরীক্ষার হলে সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। প্রশাসন বা যে কেউ চাইলে সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে দেখুক। আমরা যে নকলের দাবি করেছি বা নকল করতে চেয়েছি—এমন একটা প্রমাণও কেউ দেখাতে পারবে না। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখলেই বোঝা যাবে হলের ভেতর আমাদের সাথে কী করা হয়েছে।”

​পরীক্ষার হলের ভেতরে শিক্ষকরা কীভাবে মানসিক হয়রানি করেন, তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে লিজা নামের একজন শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পরীক্ষার হলে মনোযোগ দিয়ে লেখার পরিবেশ দেওয়ার পরিবর্তে শিক্ষকরা এসে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত জীবন এবং প্রেমঘটিত (রিলেশন) বিষয় নিয়ে নানারকম অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন ও আলোচনা করেন।

এই পরীক্ষার্থী আরও জানায়, কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে অতিরিক্ত খাতা (লুজ শিট) নিলে শিক্ষকরা তাকে উদ্দেশ্য করে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘ব্রিলিয়ান্ট’ বলে কটূক্তি করেন।এছাড়াও শিক্ষকরা পরীক্ষার্থীদের মানসিক চাপ দিতে বলেন— “তোমরা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী, পরীক্ষা শেষ করতে তোমাদের এতক্ষণ সময় লাগার কথা না।”

​একজন শিক্ষকের কাছ থেকে পরীক্ষার হলে এমন উপহাস ও মানসিক নির্যাতন কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা এসবেরই প্রতিবাদ করেছি।

শুধু মানসিক হয়রানিই নয়, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় সামান্য কারণে বা কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই একের পর এক খাতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার হলে একজন ছাত্রীকে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই দীর্ঘ ৩০ মিনিট খাতা কেড়ে নিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। একজন পরীক্ষার্থীর জন্য পরীক্ষার মূল্যবান ৩০ মিনিট এভাবে নষ্ট করা চরম মানসিক নির্যাতন ও অন্যায্য বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।

​সাব্বির নামের পরীক্ষার্থী নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ​”নকল করার জন্য নয়, একের পর এক খাতা নিচ্ছিলো এবং কথাও বলতেছিলো কক্ষ পরিদর্শকরা। এজন্য পরীক্ষা শেষে আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম।”

 

​আন্দোলনে শামিল হওয়া জিহাদ নামের আরক শিক্ষার্থী বলেন: ​”আমরা কোনোভাবেই মোবাইল দেখে বা নকল করে পরীক্ষা দেওয়ার পক্ষে নই। কিন্তু পরীক্ষার হলে যে ধরনের কঠোরতা দেখানো হচ্ছে, তা কোনো স্বাভাবিক পরিবেশ নয়। আমরা চাই পরীক্ষার হল যেন ভীতিমুক্ত ও মানবিক হয় এবং আন্দোলন চলাকালে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর যে লাঠিচার্জ ও বলপ্রয়োগ করা হয়েছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত হোক।”

​আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা শতভাগ সুষ্ঠু, সুন্দর এবং নকলমুক্ত পরীক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে। তবে পরীক্ষার হলে যেন একটি স্বাভাবিক ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের ওপর অন্যায্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হবে না। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের এই যৌথ আন্দোলন চলাকালে লাঠিচার্জ এবং গ্রেনেড (কাঁদানে গ্যাস বা সাউন্ড গ্রেনেড) হামলার মতো নির্মম বলপ্রয়োগ করা হয়েছে।

অপরদিকে ফাতেমা-মতিন মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্রসচিব মহিউদ্দিন বাচ্চু বলেন, ‘সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কেন্দ্রে কঠোরভাবে নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা নিচ্ছিলাম। কিন্তু পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন কমন না পড়ায় তারা নকলের দাবি তোলে। আমরা বাধা দিলে তারা পরিকল্পিতভাবে বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে পরীক্ষা শেষে এই তাণ্ডব চালায়। এতে কলেজের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমরা বিষয়টি প্রশাসন ও বোর্ড কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’

কেন্দ্রসচিব আরও জানান, কেন্দ্রে চরফ্যাশন সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আইসিটি পরীক্ষা চলছিল। আজ মোট ৯০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উপস্থিতি ছিলেন ৮৮৪ জন। পরীক্ষা শুরু হলে পরীক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, এমসিকিউ (বহুনির্বাচনী প্রশ্ন) এবং লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কমন পড়েনি ও অত্যন্ত কঠিন হয়েছে। একপর্যায়ে পরীক্ষার্থীরা দেখাদেখি ও নকল করার দাবি জানালে দায়িত্বরত শিক্ষকেরা তাতে বাধা দেন। নকল করতে না দেওয়ায় পরীক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণ শুরু করেন, শিক্ষকদের ট্রল করতে শুরু করেন। শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়।