সর্বশেষঃ

চরফ্যাশনে প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ঘুষ না পেলে ফাইল নড়ে না

ডেস্ক রিপোর্ট : ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সরকারি বরাদ্দের অর্থ লুটের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে একাধিক প্রধান শিক্ষকের অভিযোগে। তাদের দাবি- একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট নানা অজুহাতে শিক্ষকদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে, আর টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই আটকে দেওয়া হচ্ছে বিল-ফাইলের কাজ।

হাজিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনির হোসেনের অভিযোগ, এরিয়ার বিলের জন্য উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে তাকে দিতে হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। এরপরও ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার বিল আটকে রেখে অফিসের ‘সাত্তার’- এর নাম করে আরও ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয়- আর তা না দেওয়ায় আজও স্বাক্ষর হয়নি তার বিলে।

শুধু তিনি একা নন। মিয়াজানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নাছির উদ্দিনসহ একাধিক শিক্ষকও নির্বাচনী কেন্দ্র সংস্কারের বরাদ্দ থেকে টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।

অভিযোগে উঠে এসেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চরফ্যাশনের ৪২টি ভোটকেন্দ্র সংস্কারের জন্য প্রতিটির বিপরীতে বরাদ্দ ছিল দেড় লাখ টাকা করে। কিন্তু নির্বাচনের প্রায় চার মাস পর অর্থ ছাড় হলেও প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে ৯ হাজার টাকা করে।

আন্তঃইউনিয়ন ফুটবল টুর্নামেন্ট ও প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার বরাদ্দও ইউনিয়ন পর্যায়ে সঠিকভাবে পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ। মধ্য উত্তর মাদ্রাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাই খান বলেন, ফুটবল টুর্নামেন্টে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের অধিকাংশ বরাদ্দই তারা পাননি। একই অভিযোগ আসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনেরও।

সবচেয়ে মর্মান্তিক অভিযোগটি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের নিয়ে। মধ্য উত্তর ফ্যাশন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাই হাওলাদার জানান, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের তালিকা সংগ্রহ করা হলেও বরাদ্দকৃত ৯০ হাজার টাকার কোনো ডিভাই্স তারা এখনো পাননি।

‘এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি’ খাতেও অনিয়মের অভিযোগ কম নয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২টি বিদ্যালয়ে ৩ লাখ টাকা করে, পরের বছর আরও আটটি বিদ্যালয়ে ৩ লাখ ও একটিতে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়- কিন্তু বাস্তবে সে অনুযায়ী কাজ হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষকদের। বরং একই প্রতিষ্ঠানকে বারবার বরাদ্দ দিয়ে বঞ্চিত করা হয়েছে অন্যদের।

উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে ১৮৬ নম্বর দক্ষিণ চর আইচা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা- যেটি একই সময়ে এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি, মেরামত-সংস্কার এবং পুনরায় এডুকেশন ইন ইমার্জেন্সি- তিন খাতেই বরাদ্দ পেয়েছে। একইভাবে পূর্ব নুরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও দুই খাতে মোট সাড়ে ৪ লাখ টাকার বরাদ্দ পেয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে। যেসব বিদ্যালয়ে ওয়াই-ফাই সংযোগই নেই কিংবা ইন্টারনেট সচল নয়, সেসব ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কোনো প্রত্যয়নপত্র ছাড়াই এক কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশে তোলা হয়েছে ১৮ লাখ ১৫ হাজার ২০০ টাকা।

এ ছাড়া প্রাক-প্রাথমিক খাতে বিদ্যালয়প্রতি ৭ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ থেকে ৫০০ টাকা করে কাটার অভিযোগ, কনটিনজেন্সি, বই পরিবহন, টিএ, বিভিন্ন দিবস পালন এবং ৯৬ জন শিক্ষকের বিনোদন ভাতার বিল ছাড়েও টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

চরফ্যাশন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন।

তিনি দাবি করেন, অভিযোগগুলোর বিপরীতে তার কাছে পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে এবং প্রয়োজনে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তা উপস্থাপন করবেন।

তবে বিষয়টি নিয়ে অন্ধকারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম নিজেও। তিনি বলেন, ‘আমি এই প্রথম আপনার কাছে তার বিষয়ে এত অভিযোগের কথা শুনলাম। আমার কাছে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আসেনি। যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, তারা তদন্ত করে দেখবে। আমার কাছে এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’