ভোলায় খাল পুনঃখননের নামে প্রায় ৯ কোটি টাকার হদিস নেই
বিশেষ প্রতিনিধি:
কৃষি সেচ, পানি প্রবাহ সচল রাখা এবং দিনমজুরদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার সারাদেশে ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে প্রায় ৪২০ কোটি ৮৮লক্ষ ১৯ হাজার ৭শত ৬৮ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের প্রকল্প গ্রহণ করে। সেই প্রকল্পের আওতায় ভোলার চার উপজেলায় ১০ কোটি ৫৬ লাখ ৭ হাজার ৪৪৬ টাকা ব্যয়ে প্রায় ৪১ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমোদিত তালিকার বেশ কয়েকটি খালের কিছু অংশে কোনো কাজই হয়নি। আবার যেখানে কাজ হয়েছে, সেখানে বরাদ্দের তুলনায় কাজের পরিমাণ অত্যন্ত কম বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে দিনমজুরের নামে বরাদ্দের অর্ধের টাকার কোন কাজই হয়নি।
প্রকল্পের অনুমোদিত নথিপত্র অনুযায়ী, লালমোহনের ডাকাতিয়া খালের ৪ কিলোমিটারের জন্য ১ কোটি ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৯০ টাকা এবং কালির খালের ৪ কিলোমিটারের জন্য একই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। তজুমদ্দিনের কাজিকান্দি খালের ৪ কিলোমিটারের জন্য ১ কোটি ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৯০ টাকা এবং দাশেরহাট এলাকায় ৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের জন্য ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
এছাড়া চরফ্যাশনের বেতুয়া খালের ৮ কিলোমিটার পুনঃখননের জন্য ২ কোটি ৬ লাখ ৩ হাজার ৮০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ভোলা সদরের ধনিয়া এলাকায় ৪ কিলোমিটারের জন্য ১ কোটি ৩ লাখ ৩ হাজার ৬৯০ টাকা, চরসামাইয়া খালের ৫ কিলোমিটারের জন্য ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা, ভেদুরিয়ায় ২ কিলোমিটারের জন্য ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা এবং বাপ্তা এলাকায় ৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের জন্য প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দের তথ্য পাওয়া গেছে।
নথিপত্রে আরও উল্লেখ রয়েছে, মোট বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক টাকা অর্থাৎ ৫কোটি ২৪লক্ষ ৩৩ হাজার ৬শত ৬৬টাকা দিনমজুর ও ৩৮ হাজার ৭শত টাকা শ্রমিক সরদারের (ওয়েজ) মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের কথা। বাকি প্রায় অর্ধেক বরাদ্দ অর্থাৎ ৫কোটি ৩১লক্ষ ৩৫হাজার ৮০টাকা ভেকু বা অন্যান্য যন্ত্রপাতি (নন ওয়েজ) ব্যবহার করে খাল পুনঃখননের জন্য নির্ধারিত রয়েছে।
তবে অভিযোগ উঠেছে, দিনমজুরদের শ্রমের জন্য যেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, দিনমজুরদেরকে দিয়ে কোন ধরনের কাজ করায়নি। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দিনমজুর হিসেবে তালিকাভুক্ত করে তাদের নামে ব্যাংক হিসাব খোলার মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। তাছাড়া যন্ত্রপাতি ব্যবহারের জন্য বরাদ্দকৃত বিপুল অঙ্কের অর্থের বিপরীতে প্রকৃত কাজ হয়েছে খুবই সীমিত।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেছেন খাল পুনঃখননের কাজে ব্যবহৃত কয়েকটি ভেকুর মালিক ও ভেকু চালকদের সাথে। খাল পুনঃখননে তারা ঠিকাদার থেকে যেই বিল নিয়েছেন তাদের দেওয়া সেই হিসাব অনুযায়ী, ১কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তবে খনন কাজে প্রায় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়নি বলে তারা দাবি করেন। তাদের এই হিসাব সঠিক হলে, ভোলায় ১০ কোটি ৫৬ লক্ষাধিক টাকার প্রকল্পে প্রকৃত কাজের ব্যয় সোয়া কোটি থেকে দেড় কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। সেই হিসেবে ১০ কোটি টাকার বরাদ্দের মধ্যে ৯ কোটি টাকাই লোপাট করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
একই অভিযোগ রয়েছে ভোলা সদর উপজেলার প্রকল্পগুলো নিয়েও। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছু খালের নির্ধারিত অংশে কোনো পুনঃখনন হয়নি। আবার যেসব স্থানে কাজ হয়েছে, সেখানে খালে ছুইছুই পানি থাকায় খালের গভীরে খনন করা সম্ভব হয়নি বলে স্থানীয়রা জানান। তাদের দাবি, অনেক স্থানে খালের গভীরে খনন না করে পাশের মাটি কেটে সরানোর মধ্যেই কাজ সীমাবদ্ধ ছিল। কিছু স্থানে সেইটিও হয়নি শুধুমাত্র গাছের ঢালপালা ছেটে দেওয়া হয়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে ১০ কোটি ৫৬ লক্ষাধিক টাকার বরাদ্দের বিপরীতে প্রকৃতপক্ষে কত টাকার কাজ হয়েছে? শ্রমিকদের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা? তালিকাভুক্ত শ্রমিকরা সত্যিই কাজ করেছেন কি না? যন্ত্রপাতি ব্যবহারের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের বিপরীতে কী পরিমাণ কাজ হয়েছে?
এ বিষয়ে ভোলার জেলা প্রশাসক ডা. শামিম আহমেদের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি জানান, কাজ তদারকির জন্য টিম গঠন করা হয়েছে। যেসব এলাকা থেকে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেসব এলাকার বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এদিকে খাল পুনঃখননে পরিদর্শন করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী ও সদর আসন সাংসদ ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি পরিদর্শনকালে বলেছেন যেসব এলাকায় খাল পুনঃখনন পুরোপুরি করা হয়নি সেসব পুনরায় দখল খনন করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হবে।
সূত্র : দৈনিক আজকের ভোলা।