ভোলায় শিক্ষা অফিসার-হিসাবরক্ষক সিন্ডিকেটের পকেটে সরকারের কয়েক লাখ টাকা
ডেস্ক রিপোর্ট :
জেলা শিক্ষা অফিসে অনিয়ম ও জালিয়াতি যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের অর্থায়নে নারী শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, সাইন্স প্রজেক্টের বরাদ্দ এবং এনসিটিবি থেকে পাঠানো শিক্ষার্থীদের বই পরিবহনের খরচ—কোনোটাই রেহাই পাচ্ছে না সিন্ডিকেটের হাত থেকে। জেলা শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এ. কে. এম ছালেহ্ উদ্দিন এবং হিসাব সহকারী কাম ক্লার্ক মো. জাহিদ হোসেনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট ভুয়া ভাউচার ও অর্থ আটকে রেখে হাতিয়ে নিয়েছে সরকারের কয়েক লাখ টাকা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ১৪ই জুন জেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পান এ. কে. এম ছালেহ্ উদ্দিন। অথচ দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় (আজ ১৯শে জুন) তার বিরুদ্ধে একে একে উঠে আসছে সরকারের লাখ টাকা অনিয়মের খতিয়ান। শুধু জেলা শিক্ষা অফিসই নয়, তার মূল কর্মস্থল ‘ভোলা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’-এ অনিয়ম ও নিয়মবহির্ভূত শিক্ষার্থী ভর্তি করানো এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিম্নমানের টিফিন দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ‘প্রাইমারি হেলথ কেয়ার (HSS4PHC)’ প্রকল্পের অধীনে ৭০ জন নারী শিক্ষকের ৩ দিনব্যাপী “Teachers Training on Life Skills Education” প্রশিক্ষণে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে নাস্তা ও খাবারের বাজেটের অর্ধেকের কাছাকাছি অর্থ লোপাট করা হয়। প্রশিক্ষণার্থীদের দিনে ৬৫০ টাকার বদলে ১,৪১০ টাকার নিম্নমানের খাবার খাইয়ে মোট ৯৮,৫৫০ টাকা খরচ করা হয়। আর অবশিষ্টাংশ ৭৬,৪৫০ টাকা (বরাদ্দের ৪৩%-এর বেশি) ভুয়া হিসাব দেখিয়ে পকেটে পুরেছেন জেলা শিক্ষা অফিসার ছালেহ্ উদ্দিন, হিসাব সহকারী জাহিদ ও এনজিও প্রতিনিধি নাজমুল হুদার সিন্ডিকেট।
এছাড়াও সরকারের “Startup, Science Project and Innovation Idea Showcasing-2026” কর্মসূচির ১ লাখ ১৮ হাজার টাকার বাজেট সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হলেও বাস্তবে ব্যয় করা হয়েছে অর্ধেকেরও কম। ১০০ জন অতিথির আপ্যায়ন বরাদ্দ থাকলেও উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৪৫ জন। নাস্তায় ৮ হাজার টাকার জায়গায় ৩,৬০০ টাকা এবং খাবারের ৪০ হাজারের জায়গায় মাত্র ১০ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়, যা বিসমিল্লাহ হোটেলের মালিক নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া ভেন্যু ব্যবস্থাপনা ও বিজয়ী দলের ক্রেস্ট ক্রয়ে ২১ হাজার টাকার বিপরীতে বরিশাল থেকে মাত্র ৭ হাজার টাকার ক্রেস্ট কিনে ভুয়া ভাউচার বানিয়ে বাকি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। বিষয়টি প্রকাশ পেলে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পুনরায় ব্লাঙ্ক ভাউচার এনে জালিয়াতি ঢাকতে মরিয়া হয়ে ওঠে সিন্ডিকেটটি।
বাদ যায়নি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) থেকে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বই বহনের খরচের জন্য গত ১৮ জুন ১৯,৬০৩ টাকার একটি সরকারি বরাদ্দ এনসিটিবি ঢাকা শাখা থেকে আসে। গত ২৪ জুন ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে এই টাকা নগদ উত্তোলন করা হলেও তা প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে তুলে দেননি ছালেহ্ উদ্দিন। ফলে নিজ খরচে বই পরিবহন করতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এ জেলার কারিগরি স্কুল ও কলেজের শিক্ষকরা।
শুধু এই বিষয়গুলোই নয়, জরিপের টাকা, তেল এবং গাড়ি মেরামতের ভুয়া ভাউচার বানিয়ে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে ছালেহ্ উদ্দিন ও জাহিদ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
এসব অনিয়মের বিষয়ে হিসাবরক্ষক কাম ক্লার্ক মো. জাহিদ হোসেনের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি কোনো অনিয়ম করিনি, কোন খাতে কত ব্যয় করেছি তার সঠিক প্রমাণ আমার কাছে আছে। একটি টাকাও সরাইনি ।
ভাউচার জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা শিক্ষা অফিসার এ.কে.এম ছালেহ্ উদ্দিন বরাবরের মতোই দায় এড়িয়ে বলেন, “বরাদ্দকৃত অর্থ অনুষ্ঠান ও বাস্তবায়নেই সঠিক নিয়ম মেনে ব্যয় করা হয়েছে, কোনো অনিয়ম হয়নি।”
তবে মাউশি পরিচালক (মাধ্যমিক) প্রফেসর মোঃ সাখাওয়াত হোসেন খান স্পষ্ট জানিয়েছেন, সরকারি অর্থ আটকে রাখা বা ভুয়া ভাউচারে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে দ্রুত তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রশাসনিক ও আইনি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।