ভোলা সরকারি কলেজ: শিবির-ছাত্রদলের মুখোমুখি অবস্থানে কার অর্জন কতটুকু ?
ডেস্ক রিপোর্ট :
ভোলা সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে কয়েক দিন ধরে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমের চেয়ে রাজনৈতিক উত্তাপের কারণে জেলা শহর পেরিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ইসলামী ছাত্রশিবিরের নবীনবরণ এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ ও ক্রীড়া কর্মসূকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, তা শেষ পর্যন্ত শ্রেণি কার্যক্রম ও পরীক্ষা স্থগিত, পুলিশ মোতায়েন এবং ক্যাম্পাসের বাইরে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির মধ্য দিয়ে গড়ায়।
গত ১৫ অক্টোবরকে ঘিরে দুটি ছাত্র সংগঠনের অটল অবস্থান এবং পরবর্তী ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে রাজনৈতিক কৌশল, প্রশাসনিক ভূমিকা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির এক বস্তুনিষ্ঠ চিত্র সামনে আসে।
সূত্রে জানা গেছে , ইসলামী ছাত্রশিবির লিখিত আবেদনের মাধ্যমে কলেজ প্রশাসনের কাছ থেকে ১৫ অক্টোবরের নবীনবরণ অনুষ্ঠানের জন্য প্রাথমিক অনুমোদন লাভ করে। অপরদিকে ছাত্রদল একইদিনে অনুষ্ঠানের কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে প্রশাসন বরাবর আবেদন করলে উদ্ভূত পরিস্থিতি ও সংঘাত এড়াতে প্রশাসন পরবর্তীতে সেই অনুমতি বাতিল করে।
ক্যাম্পাসে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ হওয়ার পর শিবির তাদের পূর্বনির্ধারিত ‘নবীনবরণ ও ক্যারিয়ার গাইডলাইন’ অনুষ্ঠানটি বন্ধ না করে স্থান পরিবর্তন করে। তারা শহরের চাইনিজ রেস্টুরেন্ট চিলিতে বিকল্প আয়োজনে নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ করে নেয়। এর মাধ্যমে তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে কার্যক্রম পরিচালনায় নিজেদের শৃঙ্খলার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে। পাশাপাশি দাপ্তরিক অনুমোদন ও বাতিলের লিখিত নথিপত্র প্রকাশ্যে এনে তারা নিয়মতান্ত্রিক অবস্থানের পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরে ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলন করেন শিবির সভাপতি মো. আল-আমিন। তবে নিজস্ব ক্যাম্পাসের উন্মুক্ত মাঠে বিশাল আয়োজনের যে পরিকল্পনা ছিল, স্থান পরিবর্তনের কারণে তা বেশ সীমিত হয়ে পড়ে।
কলেজ প্রাঙ্গণে ১৪ ও ১৫ তারিখ সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে প্রশাসন । তবে ১৪ তারিখ ছাত্রদল ক্যাম্পাসে অবস্থান নিলেও শিবির নেতাকর্মীদের দেখা যায়নি। এছাড়াও ১৫ অক্টোবর কলেজের বাইরে রাজপথে বড় আকারের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি ও জনবলের জানান দেয় কলেজ ছাত্রদল। তবে লিখিত আবেদন প্রশাসনের কাছে জমা দিয়ে অনুমতি চাইলেও সারা মিলেনি বলে অভিযোগ করেন কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক আরাফাত ইসলাম ইফতি।
একইদিনে ক্যাম্পাসের সার্বিক বিষয়ে সংবাদের জেরে ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের সাথে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের সাথে উচ্চ বাক্য বিনিময়ের কারণে জেলার সাংবাদিক নেতারা বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি আবদুল্লাহ আল রাসেল ও সাধারণ সম্পাদক নূর মোহাম্মদ রুবেল জেলা ও ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের সাথে কথোপকথনে স্পষ্ট করেন যে, স্বাধীন গণমাধ্যম ও মুক্ত সাংবাদিকতায় ছাত্রদল বিশ্বাসী এবং ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের কাজে তাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার বাধা বা হস্তক্ষেপ করা হয়নি।
দুই পক্ষের সংঘাতময় পরিস্থিতির আশঙ্কায় সংঘাত এড়াতে ১৫ অক্টোবর ভোলা সরকারি কলেজের সকল পরীক্ষা ও শ্রেণি কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে কলেজ প্রশাসন। এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. ইসরাফীল জানান, প্রথমে শিবির লিখিত আবেদন করায় অনুমতি দেওয়া হলেও পরবর্তীতে ছাত্রদল একই দিনে কর্মসূচি ঘোষণা করায় শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার্থে পূর্বের অনুমতি বাতিল করতে হয়েছে।
ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সার্বিক নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ভোলা সদর ইউএনও সজল চন্দ্র দাস ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোহান সরকার ক্যাম্পাস পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের মুঠোফোনে জানান, “কলেজের ক্যাম্পাস ও ভোলা শহরের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে ছিল। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতেই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।”
ক্যাম্পাসে সাংবাদিকতার পরিবেশ ও নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন জেলার বিশিষ্ট মানবাধিকার ও সাংবাদিক নেতারা। ভোলা জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি নজরুল হক অনু বলেন, “ক্যাম্পাসের তথ্য সংগ্রহ ও সংবাদ প্রকাশে সাংবাদিকরা যেন কোনো প্রকার ভয়-ভীতি বা বাধার মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করা কলেজ কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। ভোলা সরকারি কলেজে বস্তুনিষ্ঠ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ সুনিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।”
একইভাবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষাঙ্গনের সুস্থ পরিবেশ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ভোলা জেলা শাখার সভাপতি মোবাশ্বেরউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ” ভোলার একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠে রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ হওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের মতো পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা চাই ক্যাম্পাসে সব ছাত্র সংগঠনের সহনশীল রাজনীতি ও সুস্থ সহাবস্থান বজায় থাকুক। পাশাপাশি কলেজ প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ সুনিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখা জরুরী।”
তবে রাজনৈতিক এই দড়ি টানাটানির প্রধান খেসারত দিতে হয়েছে কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কলেজের একাদশ শ্রেণির এক ছাত্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের রাজনীতি নিয়ে মাথাব্যথা নেই, আমরা শুধু সময়মতো পরীক্ষা ও ক্লাস চাই। রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়া এবং ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হওয়া আমাদের শিক্ষাজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিলো।”